এর আগের ব্লগটি তে আমরা রঙ আর তার গুপ্তকথা নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। কি অদ্ভুত
ব্যাপার, কোন বস্তু যে রঙ বর্জন করে, তাই দিয়েই হয় তার পরিচয়। এটা যদি মানুষের
ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা হয়, খুব চিত্তাকর্ষক থিওরি তৈরি হতে পারে।
আজ আমরা বিজ্ঞানের একটি প্রাথমিক বিষয়ে আলোচনা করব, শক্তি (Energy), আগের মতই,
আমরা যথাসম্ভব কঠিন থিওরি আর ক্যালকুলেশন বর্জন করব।
|
|
শক্তি বা এনার্জি
|
|
1.0
|
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আমরা বেশ কিছু শব্দ কিছু একটি
“ব্যাপারের” জন্য ব্যবহার করি, যেটি আমাদের কোন কাজ করতে সাহায্য করে। কখন আমরা
তাকে বলি শক্তি, কখনো ক্ষমতা, গতি, বল, ইংরিজি থেকে নেওয়া এনার্জি, পাওয়ার,
ইত্যাদি, ইত্যাদি …। সাহিত্যের ব্যাপারে বা মৌখিক কথায় এটা চলতে পারে, কোন
অসুবিধা নেই। কিন্তু বিজ্ঞানের ভাষায়, উপরের প্রত্যেকটির মানে আলাদা আলাদা। যাই হোক, এই বিশদ আলোচনা আমরা পণ্ডিতদের
উপর ছেড়ে দিয়ে এই সাধারণ ব্যাপারটিকে শক্তি বলে ভেবে তার ব্যাপারে আলোচনা করি –
তা সে সচিন তেন্দুলকারের ব্যাট, কোন এনার্জি ড্রিংক বা যা থেকেই আসুক না কেন।
|
|
2.0
|
আমরা মূর্খ লোকেরা এরকম ভাবেই
তো জানা শুরু করেছি- বিজ্ঞান বলে, এনার্জি বা শক্তি এমন একটা জিনিস, যার কিছু
“কাজ” করার ক্ষমতা আছে – আর ভেবেছি যে এ আর এমন বড় কথা কি। সত্যিই খুব বড় কথা
এটা নয়। তাই আমরা আর এক কদম আগে বাড়িয়ে পণ্ডিতদের আর একটি বক্তব্য, যেটা তাঁরা
মানুষের জ্ঞান ভাণ্ডারের খোদাই করে গেছেন- “শক্তি কখনও তৈরি করা যায় না, শক্তি
কখনও ধ্বংস করা যায় না- শুধু এক রূপ থেকে অন্য রূপে পরিবর্তন করা যায়”। এটার
মানে বোঝাটা খুব কঠিন নয়- তবে মেনে নিতে একটু অসুবিধা হয়। আমরা তো দেখি পাওয়ার
প্ল্যান্টে বিজলি তৈরি হয়। পেট্রল বা ডিজেল ইঞ্জিনে গাড়ী চালানোর – আর এত
যন্ত্রপাতি চালিয়ে কত শক্তি ধ্বংস করি আমরা। এক মুহূর্ত পিছনে রেখে এগোই- কারণ,
একটি নতুন শব্দ এই ব্যাপারের মধ্যে ঢুকে পড়েছে- “রূপ”- তার ব্যাপারটা বোঝার
চেষ্টা করি আর রূপগুলোর একটা তালিকা বানাই আর দেখি, তারা এক রূপ থেকে অন্য রূপে
পরিবর্তিত হতে পারে কিনা?
|
|
3.0
|
আমরা ছোটবেলায় যখন বিজ্ঞান
পড়তে শুরু করেছিলাম, তখন শক্তির সাতটি রূপ সম্বন্ধে শিখেছিলাম- আর তারপর একটি
অষ্টম রূপ পরে প্রবল গতিতে তার মাঝে ঢুকে পড়ে। যে রকম “বেনীআসহকলা (বা ইংরেজি তে VIBGYOR) রঙের
আলোচনা তে করেছিলাম, সেই রকম LCMMESH বলে শক্তির রূপ গুলো মনে রাখার জন্যে ব্যবহার করতাম। এটার কোন বাংলা প্রতিশব্দ নেই তাই
আমরা এই তালিকাটা প্রথমে ইংরিজিতে দেখে পরে তার বাংলা অনুবাদ করব। কয়েকটির রূপের জন্য ইংরাজি শব্দ ব্যবহার
করাটা সহজ, আমরা তাই করব।
L –
Light (আলো)
C-
Chemical – (রাসায়নিক)
M-
Mechanical (যান্ত্রিক)
M-
Magnetic – (চৌম্বক)
E-
Electrical – (বৈদ্যুতিক)
S-
Sound – (শব্দ)
H-
Heat – (তাপ)
আর অষ্টম শক্তিটি হোল atomic বা আণবিক, আর এই নতুন শিশুটির নাম সারা পৃথিবীতে ছড়াতে দুটি জাপানী শহর কে
– হিরোশিমা এবং নাগাসাকি- ধ্বংস হতে
হয়েছিল।
|
|
4.0
|
এবার আমরা দেখব যে উপরে লেখা
বিভিন্ন রূপগুলি কি ‘কাজ’ করতে পারে আর তাদের কিরকম ভাবে পরিবর্তন হয়। যেহেতু
কাজ বললে সাধারণ মানুষ হিসাবে আমরা গতিই বুঝি তাই প্রথমে আমরা বেশ কিছু
পরিবর্তনের উদাহরণ দেব – আর তা বুঝতে বুঝতে কাজের উদাহরণটাও এসে যাবে।
তবে হ্যাঁ – কিছু কিছু
পরিবর্তন এক ধাপে হয়না, মাঝে কিছু অন্তরকালীন রূপও হয়, জটিলতা কম রাখার জন্য
আমরা সেটাকে এই মুহূর্তে বাদ দিয়ে যাব।
|
|
5.0
|
a) আলোর থেকে বৈদ্যুতিক – সোলার সেল দ্বারা, আলোর
থেকে তাপ রৌদ্রস্নান বা sun
bathing (বিকিনি পরা বা ছাড়াই) আলোর থেকে রাসায়নিক – গাছ যেমন খাবার তৈরি
করে। একটু চেষ্টা করলেই পাঠক পাঠিকা আরও উদাহরণ নিজেই বার করতে পারবে।
|
|
|
b) রাসায়নিক থেকে তাপ – রাসায়নিক বিক্রিয়া (কেমিকাল রিঅ্যাকশন)- বেশির ভাগ
জ্বালিয়ে। কিছু রাসায়নিক বিক্রিয়া তাপ কমও করতে পারে। তেল বাঃ কাঠ জ্বালিয়ে আলোও পাওয়া যায়। বোমা ফাটিয়ে শব্দও
প্রচুর তৈরি (?) হয়।
|
|
|
c) যান্ত্রিক বা মেকানিক্যাল
শক্তির প্রয়োগ আমরা সব থেকে বেশি দেখতে পাই। যে কোন চলমান বস্তুর অনেক রকমের কাজ
করার ক্ষমতা থাকে। একে গতিশক্তি বা
কাইনেটিক এনার্জি বলে। আবার কোনও বস্তুকে কিছু উচ্চতায় নিয়ে গেলে তার দ্বারাও
কিছু কাজ করার ক্ষমতা থাকে। একে বলা হয় স্থিতিশক্তি বা পোটেনসিয়াল এনার্জি বলে। উঁচু
থেকে একটি ঢিল ছেড়ে দেওয়া হলে আর কারও মাথায় ফেললে তার দ্বারা বেশ ভাল পরিমাণ
কাজই হবে। হাতে হাত ঘসে হাত গরম করা যান্ত্রিক থেকে তাপ রূপ পরিবর্তনের কথা
আমাদের সকলের।চকমকি পাথর ঘসে তাপ এবং
আলো দুটোই হয়। চলন্ত ট্রেনের গতি থেকে পাওয়া শব্দ বেশ ভাল অত্যাচারই করে। চৌম্বক
শক্তির সাহায্য নিয়ে যান্ত্রিক শক্তি বিদ্যুৎ উৎপাদনও করতে পারে।
|
|
|
d) চৌম্বক শক্তি খুব একটা চোখে দেখা যায়না কিন্তু সে তার কাজ ঠিকই করে যায়।
যেমন একটু আগে আমরা দেখেছি যে যান্ত্রিক এবং চৌম্বক শক্তির সাহায্যে বিদ্যুৎ
উৎপাদন হয়। আবার ঠিক উল্টো ভাবে, চৌম্বক এবং বৈদ্যুতিক শক্তির সাহায্যে গতি রূপে
যান্ত্রিক শক্তি তৈরি হয় ইলেকট্রিক মোটরে। একই রকম ভাবে, পেট্রল বা ডিজেল
ইঞ্জিনে, তাদের রাসায়নিক শক্তি এবং চৌম্বক শক্তির সাহায্যে যান্ত্রিক শক্তি তৈরি
হয় বাস-গাড়ির মোটরে।
|
|
|
e) আবিষ্কার হবার পর থেকেই বৈদ্যুতিক
শক্তিই মানুষের সব থেকে প্রিয় রূপ।
আজকের দিনে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মানব সভ্যতার চেষ্টা এই থাকে যে শক্তির অন্য রূপ
থেকে প্রথমে বৈদ্যুতিক শক্তিতে পরিবর্তন করে নেওয়া হয়, এবং তার পর আবার
অন্য রূপে পরিবর্তন করে কাজ করা হয়। বৈদ্যুতিক শক্তি ব্যবহার হয় আলো দেবার
জন্য (সব রকম ল্যাম্প), তাপ দেবার জন্য (ইলেকট্রিক হীটার), শব্দ দেবার জন্য
(কলিং বেল), চুম্বক বানানোর জন্য (ট্রান্সফর্মার এবং ইলেক্ট্রো ম্যাগনেট) ইত্যাদি।
|
|
|
f) শব্দ খুব ছোট স্কেলে যান্ত্রিক
শক্তিরই রূপ। শব্দ থেকে বিদ্যুৎ রূপান্তর হয় টেলিফোনের মাইক্রোফোনে আর ঠিক
উল্টোটা হয় লাউডস্পিকারে। বড় শব্দ পটকা বা বোমার থেকে বার হয়ে যখন জানালার কাঁচ
ভাঙ্গে, সেটা শব্দ থেকে যান্ত্রিক শক্তির একটি ভাল উদাহরণ।
|
|
|
g)
বৈদ্যুতিক শক্তির মত তাপশক্তিও এক বহু ব্যবহৃত রূপ। আলোর মত তাপশক্তিও মূলত সূর্যদেবেরই দান,
লুকিয়ে থাকে নানা রূপের মধ্যে। খাবার থেকে শুরু করে তাপশক্তির ব্যবহার ঘরে ঘরে
রাস্তায় রাস্তায়, কল কারখানায়, রাস্তা ঘাটে। আবার অন্য সব রকমেরই পরিবর্তনের
মধ্যেও তাপ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তৈরি হয় কিন্তু অব্যবহার্য হিসাবে নষ্ট হয়। পাঠক
পাঠিকারা অনেক লম্বা লিস্ট বানিয়ে নিতে পারেন।
|
|
|
h) আমি আণবিক (অ্যাটমিক) শক্তি সম্বন্ধে
কিছু লিখবনা, কারণ বিষয়টি কিছু জটিল এবং বোঝানো বেশ কঠিন। এটুকুই শুধু বলতে চাই
যে এই শক্তির ধ্বংসাত্মক ক্ষমতাকে বাদ দিয়ে যদি এর মাঝে লুকিয়ে থাকা গুণ কে আমরা
ঠিক ভাবে প্রয়োগ করতে পারি, তাহলে আমেরিকার নাগরিকদের গড় বয়েস অনেক বাড়তে পারে
কারণ তেলের খোঁজে সব জায়গায় নাক (যেটা বহুদিন ধরে রক্তাক্ত হয়েই আছে)গলাতে হবেনা
আর ছোটছোট ছেলে মেয়ে গুলোর জীবন দান করতে হবেনা।
|
|
6.0
|
বিজ্ঞানের ছাত্রছাত্রী না হলেও
মানুষের চিন্তাধারা বিজ্ঞান ভিত্তিক হতেই পারে। এই লেখাগুলোর উদ্দেশ্য সেই রকম
সায়েন্টিফিক মাইন্ড তৈরি করতে সাহায্য করা। আমি আবার ফিরে আসবো আরও কিছু
প্রচেষ্টা নিয়ে।
|
No comments:
Post a Comment